তাম্রলিপির স্বত্বাধিকারী এ কে এম তারিকুল ইসলাম রনি বলেন, একদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যদিকে যানবাহন সংকট। মেলায় লোকসমাগম কম হবে এটাই স্বাভাবিক। যানবাহন সংকট না থাকলে লোকসমাগমের এই চিত্রটা অন্যরকম হতে পারত।
ঐতিহ্য প্রকাশনীর ব্যবস্থাপক আমজাদ হোসেন কাজল বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের রায়ের কারণে নাশকতার আশঙ্কায় বইপ্রেমীরা মেলায় আসেনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা মেলায় প্রভাব ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করছে। তবে আজ শুক্রবার থেকে মেলা তার চিরচেনারূপে ফিরে যাবে-এমন প্রত্যাশা তাদের।
অবসর প্রকাশনীর বিক্রয় ব্যবস্থাপক মাসুদ রানা বলেন, খালেদা জিয়ার রায় আমাদেরকে এক খণ্ড অবসর দিয়েছে। তবে এই অবসর দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলেই মনে করেন তিনি।
শিশু চত্বরে যত ভুলে ভরা বই :অজস্র ভুলে ভরা বইয়ে ছেয়ে আছে শিশুচত্বরের স্টলগুলো। আজ শিশু প্রহর। ফেব্রুয়ারি মাসের সাপ্তাহিক ছুটির প্রতিটি দিনকেই শিশুপ্রহর ঘোষণা করেছে বইমেলা কর্তৃপক্ষ। শিশুরা যাতে নির্বিঘ্নে আসতে পারে, বই পাঠে আগ্রহী করে তুলতে বইমেলায় শিশুচত্বর করা হয়। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে এত আয়োজন করা হলেও মূল জিনিস যে বই সেদিকে নজর নেই কারো। অযত্নে ছাপা ও ভুলে ভরা সেসব বই কিনছে শিশুরা। মা-বাবারাও না দেখে, না বুঝে সেসব বই তুলে দিচ্ছেন শিশুদের হাতে।
বাংলা একাডেমি আর বইমেলা কমিটি কোনো বাছবিচার না করেই এদের প্রতিবছর নিয়মিতভাবে স্টল বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে। কোনো রকম জবাবদিহিতা নেই তাদের। প্রকাশনা মানসম্পন্ন না হলেও তারা অলৌকিক কারণে বারবার স্টল বরাদ্দ পাচ্ছেন।
শিশু চত্বর ঘুরে দেখা যায় এখানকার স্টলগুলোতে অজস ভুলে ভরা বই। যত্ন নিয়ে লেখাও খুব কম। উত্কট রং ব্যবহার, চড়া দাগের ইলাস্ট্রেশনে সেসব বই। বানান ভুল, ছড়ায় ছন্দ ভুল তো রয়েছেই। প্রায় অশিক্ষিত লেখকরা যেসব কথা ছড়ায় তুলে ধরেছেন, এককথায় তা ভয়াবহ।
চলন্তিকা বইঘরে দেখা গেল ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটির গদ্যরূপ বই আকারে প্রকাশ করেছে। বইয়ে লেখকের নাম লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই গল্পের মূল লেখা যে কবিতায় আর এই গদ্যরূপ যে রবীন্দ্রনাথের লেখা নয় সে কথা কোথাও উল্লেখ নেই। একইভাবে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর লেখাও ছাপিয়েছে তারা। বড় লেখকদের নাম ব্যবহার করে ব্যবসা করা হচ্ছে।
শিশু সাহিত্য বই ঘর-এ দেখা গেল বাংলার প্রচলিত শিশু সাহিত্য, জসীম উদ্দীনের ‘বাঙালির হাসির গল্প’কে চুরি করে অন্যদের নামে বাজে গদ্যে ছাপানো। শুধু গল্পের চরিত্র বদলে দেওয়া। বিদেশি উপকথার নীতি গল্পগুলোকেও ভিন্ন নামে ভুল বাংলায় ছাপা হয়েছে। এসব বই বিক্রিও হচ্ছে দেদারসে। এমনিভাবে আজেবাজে প্রকাশনার দেখা মিললো ইগনাইট পাবলিকেশন্স, পঙ্খিরাজ, বাবুই প্রকাশনী, শিশুরাজ্য প্রভৃতি স্টলে। এসব বাজে বইয়ের দাম বেশ কম। কম দামের কারণে ভালো মানের বই প্রকাশকরা মার খাচ্ছেন। যেমন গোল্ডেন বুকস, ডাক, পাতাবাহার, শব্দশিল্প প্রকাশক, সিসিমপুর ও বিজয় ডিজিটাল খুব ভালো মানের বই নিয়ে এসেছে বইমেলায়। এ প্রসঙ্গে কবি আসাদ চৌধুরী বলেন, প্রকাশনা যেন নির্ভুল হয় এ বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে প্রকাশকদের। শিশুদের বইয়ে ভুল থাকলে তারা ভুল শিখে বড় হবে। মানসম্পন্ন বই নেই, বাজে প্রকাশনা তারপরেও কেন প্রতিবছর এসব প্রতিষ্ঠান স্টল বরাদ্দ পাচ্ছে — এমন প্রশ্নের জবাবে বইমেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. জালাল আহমেদ বলেন, মেলার এ বিষয়গুলো দেখার জন্য টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। টাস্কফোর্স মেলা পরিদর্শন করে এসব স্টলগুলো চিহ্নিত করবে। এরপর আগামীতে তাদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হবে না।
নতুন বই :গতকাল অষ্টম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ৬৪টি। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ১৯টি, উপন্যাস ৭টি, গল্প ৮টি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ৪টি ও অন্যান্য ২৬টি। গতকাল প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইগুলো হলো : অনন্যা এনেছে মুস্তাফা জামান আব্বাসীর উপন্যাস ‘সন্ধ্যে হয়নি এখনো’, নবরাগ এনেছে রফিকুর রশীদের কিশোর উপন্যাস ‘আমাদের স্কুলে সত্যিই ভূত ছিলো না’, গ্রন্থকুটির এনেছে ঝর্ণাদাস পুরকায়স্থের গল্পগ্রন্থ ‘আনন্দলোকে, ঐতিহ্য এনেছে রাফিক হারিরির উপন্যাস ‘ওমর’, অনন্যা এনেছে সিরাজুল ইসলাম মুনিরের ভ্রমণকাহিনী ‘মহাচীনের মহাজাগরণ’ ইত্যাদি।
মেলামঞ্চে অনুষ্ঠান :গ্রন্থমেলায় গতকাল অনুষ্ঠিত হয় এ বি এম হবিবুল্লাহ মমতাজুর রহমান তরফদার চৌধুরী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আকবর আলি খান এবং মেসবাহ কামাল। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফিরোজ মাহমুদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক পারভীন হাসান।
আকবর আলি খান বলেন, ড. হাবিবুল্লাহর গবেষণা থেকে দেখা যায় তুর্কি সুলতানরা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। দিল্লির সুলতানদের সাফল্য সম্পর্কে তিনি যে চিত্র এঁকেছেন তা আজও প্রাসঙ্গিক। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো দিল্লির সুলতানদের রাষ্ট্রপরিচালনার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে দেশ চালালে অনায়াসেই সুশাসনের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক ইতিহাসচর্চার প্রচণ্ড হুমকির কাছে ড. হাবিবুল্লাহ আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি প্রগতিশীল চেতনার আলোকবর্তিকাকে লালন ও রক্ষা করেছেন। তার লেখা শুধু বিভাগপূর্ব ভারত বা পাকিস্তানি প্রজন্মের জন্যই প্রাসঙ্গিক নয়, তার বক্তব্য আজকের প্রজন্মের জন্যও সমভাবে সত্য। ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে তিনি অজ্ঞানতার তিমিরকে চূর্ণ করেছেন।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, কান্তা নন্দী, মো. নূরুল ইসলাম, নবনীতা রায় বর্মণ, সঞ্জয় কুমার দাস।
আজকের অনুষ্ঠান :আজ শিশুপ্রহর বেলা ১১টায় শুরু হয়ে চলবে দুপুর ১টা পর্যন্ত। এরপর যথারীতি মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত। চলবে রাত নয়টা পর্যন্ত। এদিকে, অমর একুশে উদ্যাপনের অংশ হিসেবে সকাল সাড়ে ৮টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। সূত্র: ইত্তেফাক



No comments:
Post a Comment