জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) এক অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা একথা বলেন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে চলমান অধিবেশনে তারা আরো বলেন, শুধু দুর্নীতি মামলায় নয়, আন্দোলনের নামে শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা, বিদেশে অর্থ পাচার এবং সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের অপরাধেও খালেদা জিয়ার বিচার করতে হবে। তারা (বিএনপি) যে অপরাধ করেছে, দেশের মানুষ আর তাদের গ্রহণ করবে না, বরং প্রত্যাখ্যানই করবে।
পরে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও (জাপা) সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের সাথে ঐক্যতম পোষণ করে বলেছে, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বহুল আলোচিত এ রায় নিয়ে সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে অনির্ধারিত আলোচনার সূত্রপাত করেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম।
আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, অপর অংশের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের সভাপতি এস এম আবুল কালাম আজাদ ও সংরক্ষিত নারী আসনের আওয়ামী লীগের সদস্য ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি।
পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য ইয়াহিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগের শওকত আলী বাদশা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি, সংরক্ষিত আসনের মাহাবুব আরা গিনিসহ আরো একাধিক সংসদ সদস্য এ রায় নিয়ে কথা বলেন।
শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, ‘খালেদা জিয়ার এই মামলা ১০ বছর ধরে চলেছে। মামলা যাতে না চলে সে জন্য বিভিন্নভাবে মামলাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। বার বার হাজিরার তারিখ পাল্টানো হয়েছে, ৩ জন বিচারককে পাল্টানো হয়েছে। পুলিশের উপর হামলা হয়েছে, আসামী ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মামলার রায় ঘোষণার তারিখ আগে থেকেই ঘোষণা করা হয়। মামলার বিচারক নির্ধারিত সকাল ১০টায় এসে বসে আছেন অথচ খালেদা জিয়া যাননি। তিনি সাড়ে ১১টার পরে আদালতে গেলেন। এতেই প্রমাণ হয় আদালতের প্রতি, আইনের প্রতি, বিচারকের প্রতি তাঁর কোনো সম্মান নেই।’
শেখ সেলিম বলেন, ‘পুলিশ খালেদা জিয়াকে আদালতে আনার সময় যে পথে আনতে চেয়েছে তিনি সেই পথে যাননি। যে পথে গেছেন সেই পথে বিএনপির কর্মীরা সিনক্রিয়েট করার চেষ্টা করেছে। পুলিশের সঙ্গে মারমুখি আচরণ করেছে। পুলিশ ধৈর্য্যরে সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেখে তাঁকে আদালতে নিয়েছে। এরা অপরাধ করবে, দুর্নীতি করবে, অথচ তাদের কিছু বলা যাবে না। মামলার রায় বানচালের জন্য লন্ডনে বাংলাদেশের হাইকমিশনে হামলা করে বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ভাংচুর করা হয়েছে।’
আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, জেল হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের হত্যার বিচার বন্ধ করে দিয়েছিল। তার দল বিএনপির মুখে গণতন্ত্রের কথা শোভা পায় না। জেনারেল জিয়ার মতো মার্শাল ল গণতন্ত্র এ দেশে আর কোনদিন আসবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান। বঙ্গবন্ধু ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। খালেদা জিয়ার দুর্নীতির বিচার হলো। এর মধ্যে দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে।’
শেখ সেলিম প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘পাশ্ববর্তী দেশে মুখ্যমন্ত্রী জয় ললিতা, বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের দুর্নীতির বিচার হয়েছে, তারা তো কোন বিশৃঙ্খলা করেনি, নাটক সাজায়নি। তবে খালেদা জিয়ার মামলার ক্ষেত্রে কেন করা হবে? এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে এদেশে আর দুর্নীতিবাজ অপরাধীরা পার পাবে না। খালেদা জিয়ার সৌদি আরবে টাকা পাচারের যে তথ্য বেরিয়েছে, সেটিরও বিচার হবে। তারা যে অপরাধ করেছে, দেশের মানুষ আর তাদের গ্রহণ করবে না, প্রত্যাখ্যান করবে।’
জাসদের শিরীন আখতার বলেন, ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ের মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে দেশ বের হয়ে এসেছে। দীর্ঘ ১০ বছর পর হলেও দুর্নীতির মামলায় জনগণের প্রত্যাশিত রায়ই হয়েছে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। এ রায়কে কেন্দ্র করে কোথায় প্রতিবাদ হয়নি, বরং সারাদেশের মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছেন।’
তরিকতের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী বলেন, ‘অন্যায় করলে কেউ পার পায় না আজ তা প্রমাণ হয়েছে। আইনের উর্ধ্বে কেউ-ই নয়। এই মামলার রায় দেশের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মানুষ পাপ করতে করতে এমন একটা জায়গায় যায়, আল্লাহ তার সাজা দেয়।’
তিনি দাবি করেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে জিয়া পরিবারের রাজনীতির ইতি টানা হলো। এই দেশে বিএনপি আর দাঁড়াতে পারবে না। তারা আর এদেশের ক্ষমতায়ও আসতে পারবে না।’
জাসদের নাজমুল হক প্রধান বলেন, খালেদা জিয়া যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি করে বাংলাদেশকে আফগানিস্তানে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। দীর্ঘ ১০ বছর পর এই রায় হলো। বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে বলেই অনেকদিন পর বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করতে খালেদা জিয়া বছরের পর বছর অগ্নিসন্ত্রাস ও নাশকতা চালিয়েছেন। সাজা মেনে নিয়ে দেশে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরে আসার জন্য বিএনপি নেত্রীর প্রতি আহবান জানান তিনি।
এস এম আবুল কালাম আজাদ বলেন, দুর্নীতি কারণেই আদালত সাজার রায় ঘোষণা করেছে। জনগণ আবার আতঙ্কিত হয়েছিল যে উনি (খালেদা জিয়া) হয়তে আবারো অতীতের মতো লাগাতার অবরোধের ঘোষণা দেবেন। এটা না দেওয়ায় তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। দশ বছর পরে হলেও এতিমের টাকা মেরে খাওয়ায় আদালত খালেদা জিয়াকে জেল দিয়েছে, এর মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনি দাবি করেন।
ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি বলেন, ঐতিহাসিক এই রায়ের মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার রায়। ঠিকানায় নিজের বাড়িতে এতিম খানা দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছিলেন খালেদা জিয়া। এতিমের হক মেরে খেয়ে কেউ পার পায় না, তা প্রমাণ হয়েছে। কুখ্যাত খুনী ও দুর্নীতিবাজ তারেক রহমান গুন্ডা বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে লন্ডনে বাংলাদেশের দূতাবাসে হামলা চালিয়েছে। তারও বিচার হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জাপার ইয়াহিয়া চৌধুরী বলেন, ‘ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। বেগম জিয়া একদিন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বিনা অপরাধে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস সেই জেলখানায় এখন খালেদা জিয়া। আজ থেকে ২৮ বছর আগে কারাগারে থাকা অবস্থায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি বড়ই গাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছে এখন বড়ই ফলেছে। কারাবিধান অনুযায়ী এই বড়ই খাওয়া যাবে কিনা জানিনা। সুযোগ থাকলে খালেদা জিয়াকে সেই বড়ই খেতে দেয়া হোক।’
তিনি আরো বলেন, ‘আটক হওয়ার পর এরশাদ বলেছিলেন আমার মুক্তির জন্য একটি গাড়িও ভাঙা হলে সেই মুক্তি আমি চাই না।’
এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, ‘ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। তবে যে পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের জন্য খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে তা জিয়া পরিবারের লুটপাট করা অর্থের তূলনায় খুবই সামান্য। এতিমদের হক মেরে খাওয়ায় পঁচা শামুকে তার পা কেটেছে।



No comments:
Post a Comment