Bangla And English Newspaper of Bangladesh.

Full width home advertisement

বিনোদন

বিনোদন

Post Page Advertisement [Top]

ঢাকায় বাংলাদেশি ও ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হলেও যুদ্ধবিজয়ী বাংলাদেশের পথচলা ঠেকাতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল পাকিস্তান। কোনো দেশ যাতে বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেয় সেই চেষ্টার কোনো কমতি রাখেনি দেশটি।

মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সব শর্ত (জনসমর্থন, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, ভূখণ্ডের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলার আগ্রহ ও সামর্থ্য) পূরণ করলেও পাকিস্তানের কূটচালে তার সে সময়ের মিত্ররা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছিল না।
বাংলাদেশ ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল কমনওয়েলথে অন্তর্ভুক্ত হয়। আর বাংলাদেশকে সদস্য পদ দিতে প্রথমবারের মতো আলোচনা করতে হয়েছিল কমনওয়েলথকে। বাংলাদেশকে কমনওয়েলথে অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে পাকিস্তান ওই সংস্থা ছেড়ে যায়।

জাতিসংঘে পাকিস্তানের হয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল চীন। ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সদস্য পদ দেওয়ার প্রস্তাবে ‘ভেটো’ দেয় ওই দেশটি। জাতিসংঘের এসংক্রান্ত নথি থেকে জানা যায়, 

নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে চীনা প্রতিনিধি আটক পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দিদের ব্যাপারে সমাধানসহ বেশ কিছু প্রত্যাশার কথা জানিয়েছিলেন, যা ছিল পাকিস্তানেরই প্রত্যাশা।   বহু বাধা ডিঙিয়ে ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য পদ লাভ করে।

১৯৭২ সাল শেষে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশের সংখ্যা ছিল ৯৫টি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান তখন বেশ দৃঢ়। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাকিস্তান বাংলাদেশের স্বীকৃতি ঠেকানোর চেষ্টা করছিল।

সে সময়ের কূটনৈতিক নথিপত্র থেকে জানা যায়, পাকিস্তানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানো ও যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে নেওয়া। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি যে আত্মসমর্পণ 

দলিলে সই করেছিলেন সেখানে তৎকালীন পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশি বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানিদের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন।

 যুদ্ধ শেষে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডের কাছে ৯২ হাজার ২০৮ জন যুদ্ধবন্দি ছিল। পরবর্তী সময়ে তাদের ভারতে নিয়ে ১৩টি যুদ্ধশিবিরে রাখা হয়।

 পাকিস্তান ওই যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে নেওয়াকেই অগ্রাধিকার দেয়। শুরুতে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হলেও ত্রিপক্ষীয় ইস্যু হওয়ায় বাংলাদেশকে যুক্ত করা আবশ্যিক হয়ে ওঠে। 

বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছে স্বীকৃতি এবং এ দেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি তোলে। কিন্তু পাকিস্তান এতে সাড়া দেয়নি।

বাংলাদেশ ১৯৫ জন পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচারের উদ্যোগ নিলে পাকিস্তান এর বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচারণা চালায়, পাকিস্তানের সেনারা ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য লড়াই করেছে। তাই তাদের ভূমিকাকে যুদ্ধাপরাধ বলা ঠিক নয়। পাকিস্তান তার দেশে আটকে থাকা জ্যেষ্ঠ বাঙালি কর্মকর্তাদের বিচার করার হুমকি দেয়।

পাকিস্তান তার দেশের ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে বাংলাদেশে বিচারের উদ্যোগ ঠেকাতে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজে গিয়েও আবার ফিরে আসে। তবে সেই আদালতে পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল যে ওই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের এখতিয়ার পাকিস্তানের।

১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাখের ইসলামিক সম্মেলনের প্রাক্কালে বাংলাদেশকে পাকিস্তানের স্বীকৃতি দেওয়া না দেওয়ার প্রশ্ন নতুন রূপ ধারণ করেছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে ইসলামিক সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাতে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর মুসলিম দেশগুলো চাপ সৃষ্টি করেছিল। ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

এরপর ৫ থেকে ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা শেষে উপমহাদেশে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানে ফিরে যায়।

ওই চুক্তির অপব্যাখ্যা করে পাকিস্তান বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করে আসছে। আর বিচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে পাকিস্তান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বারবার হস্তক্ষেপ করছে, যার প্রভাব পড়ছে দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক সম্পর্কে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের বিজয়ের আগে ও পরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কূটনৈতিক তৎপরতার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ ও বিজয়ের পরে তিনি জেনেভায় ছিলেন।

 ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরও পাকিস্তানের আশা ছিল কিছু হবে না। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্য কিছু না কিছু করবে।

ওয়ালিউর রহমান বলেন, তখন জেনেভায় বাংলাদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে দেখা হলেও পাকিস্তানি কূটনীতিকরা কথা বলতেন না।

 বাংলাদেশি কূটনীতিকদের ‘ঢাকার প্রতিনিধি’ নামে ডাকতেন। তাঁরা বাংলাদেশ শব্দটিই উচ্চারণ করতেন না। বাংলাদেশকে তাঁরা বলতেন ‘ভারতের দখলকার পূর্ব পাকিস্তান’। দুর্ভাগ্যবশত এ দেশেরও কেউ কেউ বিদেশে বসে এমন কথা বলত।

ওয়ালিউর রহমান আরো বলেন, ‘আজ আমরা যে মুসলিম উম্মাহকে এত আপন মনে করি, ইরাক আর মিসর ছাড়া তাদের কেউই তখন আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি। পাশে ছিল ভারত আর সোভিয়েত ইউনিয়ন (বর্তমানে রাশিয়া)। ’

প্রতিবছর বাংলাদেশের বিজয় দিবসকে পাকিস্তান পালন করে থাকে ‘ঢাকার পতন দিবস’ হিসেবে। গত ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে বিষয়টি উঠেছে। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমরা ঢাকার পতন দিবস পালন করব। 

বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের উত্তেজনাকর সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটি কি আন্তরিক, স্বাভাবিক, নাকি প্রতিকূল?’

জবাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতেই গড়তে চায়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তান ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তির অপব্যাখ্যা করে বাংলাদেশকে অতীত ভুলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকে। 

কিস্তানের জন্য ১৯৭১ সাল কলঙ্কজনক যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য তা বীরত্বের। পাকিস্তান অতীত ভুলে যেতে বললেও বাংলাদেশের পক্ষে তা সম্ভব নয়।

 বরং পাকিস্তানের উচিত গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা।

 পাকিস্তানের অতীতকে অস্বীকারের সংস্কৃতির কারণে আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতামূলক উদ্যোগগুলো ভেস্তে যেতে বসেছে। পাকিস্তানকে বাদ দিয়েই এখন অন্য দেশগুলো সহযোগিতামূলক সম্পর্ক এগিয়ে নিচ্ছে।

-kalerkantho.com

No comments:

Post a Comment

Bottom Ad [Post Page]

| Designed by Colorlib